গণতন্ত্র কাকে বলে? গণতন্ত্রের মূলস্তম্ভ

  (5/5, 8 votes)

গণতন্ত্র কি?

গণতন্ত্র হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে নীতিনির্ধারণে বা প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সকল সদস্য বা নাগরিকের সমান অধিকার থাকে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সদস্য বা নাগরিকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ থাকে। নাগরিক বা সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ আইন প্রস্তাবনা, তৈরী এবং প্রণয়নের কাজ করে থাকেন।

গণতন্ত্র শব্দটি যদিও সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক পরিমন্ডলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তবুও সংস্থা কিংবা নানা ধরনের সংগঠনের ক্ষেত্রেও গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।

গণতন্ত্রের মূলস্তম্ভ:

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা মূলত তিনটি স্তম্ভ বা ভিত্তির উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। এই মূল ভিত্তিগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়, ক্ষমতার সুষম বন্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমে শাসনকার্যকে পরিচালনা করতে সার্বিক সহায়তা করে।

১. আইন বিভাগ

জনগনের জন্য সংবিধান মোতাবেক প্রয়োজনীয় আইন প্রনয়ন করাই এই বিভাগের প্রধান কাজ। নাগরিকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিগণ নির্দিষ্ট মেয়াদে আইন প্রণয়নের কাজের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত হন, আইন্সভায় স্থানপ্রাপ্ত হন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ সংবিধানের মূল কাঠামোর উপর নির্ভর করেই আইন প্রণয়ন করে থাকেন।

২. শাসন বিভাগ

প্রচলিত আইন মোতাবেক রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থাকে নির্বিঘ্ন রাখাই এই বিভাগের প্রধান কর্তব্য। নাগরিকদের ভোটের সাহায্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ মূলত শাসন বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের প্রধান হিসেবে কর্মরত থাকেন। রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলিত আইন অনুসারে প্রশাসনিক কার্যক্ররম পরিচালনা করে এই বিভাগ। এই বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাগণ সরকারের দ্বারা নিযুক্ত হয়ে থাকেন।

৩. বিচার বিভাগ

বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে মূলত এই বিভাগ গঠিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত এবং কেন্দ্রীয় শীর্ষ আদালত নিয়ে গঠিত হয় বিচার বিভাগ। এই বিভাগের প্রধান কাজ হল রাষ্ট্রের আইন মোতাবেক বিভিন্ন বিষয়ের বিচার কার্য সম্পন্ন করা। আইনসভার প্রস্তাবনা বা সিদ্ধান্ত সংবিধান সম্মত কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত বা বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহনের এখতিয়ার আছে এই বিভাগের। 

এই তিনটি মূল বিভাগের কার্যক্রম স্বচ্ছ এবং ক্ষমতার সুষম বন্টন থাকলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ভালোভাবে জনকল্যাণমূলক উপায়ে একটি রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা সম্ভব হয়ে থাকে।

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ:

সংবাদ মাধ্যম একটি দেশের সার্বিক ও সকল পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা করে সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের আয়না বলা হয় এবং বর্তমানে একে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়।

কেননা একটি দেশের শাসন ব্যবস্থা, শাসনকার্যের দায়িত্বে থাকা জনপ্রতিনিধিগণ, তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার ক্ষমতা রয়েছে সংবাদমাধ্যমের। এজন্য রাষ্ট্রের সুশাসন এবং সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করার  জন্য অন্য তিনটি মূল বিভাগের পাশাপাশি, সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অতি জরুরি।

গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিক:

একটি সুশাসন চর্চাকারী রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।

যেমন:

  • জনগণ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
  • আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ।
  • যথাবিহিত আইনের দ্বারা জনগণের জান-মালের নিশ্চয়তা।
  • প্রশাসক এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ কার্যের জন্য জবাবদিহিতা করার বিধান।
  • মানুষের মর্যাদা রক্ষায় সহায়ক হিসেবে কাজ করে গণতন্ত্র।
  • সুবিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা।
  • গণতন্ত্র, ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন, ন্যায়- সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারীতা রোধ করতে কার্যকর। করে।

গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা বা নেতিবাচক দিক:

রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের কিছু নেতিবাচক দিক এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

যেমন:

  • প্রতিনিধি নির্বাচনে জনগণের অজ্ঞতার ফলে অযোগ্য-অক্ষম- অদক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবার সুযোগ থাকে।
  • কার্যপরিচালনা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে স্থায়িত্বের অভাব এবং শাসন ব্যবস্থায় দায়িত্বহীনতার সুযোগ।
  • ব্য্যবহুল শাসনব্যবস্থা; জনমত গঠন,নির্বাচন, প্রচারকার্য প্রভৃতির পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়।
  • সংখ্যালঘুদের মত উপেক্ষিত হয়।
  • ক্ষমতাসীন দল ব্যতীত অন্যান্য পক্ষে সমর্থিত মানুষের অভাব, অভিযোগ, দাবী পূরণে কোন কাজ হয় না।
  • সকল জনগনকে একভাবে দেখা হলেও, কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্যের মাঝে সমান আগ্রহ না-ও থাকতে পারে; এই বিষয়টি অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
  • জনগণের প্রয়োজন এবং জনপ্রতিনিধির সিদ্ধান্তের মাঝে সমন্বয়হীনতার সুযোগ থাকে।
  • প্রতিনিধিত্বশীল পরোক্ষ গণতন্ত্রের কারণে জনগনের প্রত্যাশা পূরণ না হবার আশংকা থেকে যায়।
  • সুশাসন বিহীন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগনের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ হাসিলের সুযোগ বেশি থাকে।
  • ক্ষমতাসীন শক্তির পক্ষে নানা ধরনের পক্ষপাতমূলক সুবিধা পরিলক্ষিত হয়।
  • জনগণের ভোটাধিকারকে ব্যবহার করে নানা ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নানান সীমাবদ্ধতা, পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন দিক রয়েছে, একথা যেমন ঠিক। তেমনি একথাও অনস্বীকার্য, অতীতের যে কোন শাসন ব্যবস্থার তুলনায় গণতন্ত্রের সাহায্যে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সক্ষমতা দেখাতে সমর্থ হয়েছে।

 

Published By
About us  | Privacy Policy | Terms of Service
© 2022 grammarbd.com All Rights Reserved.